বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা সালমান শাহ্র ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর হঠাৎ প্রয়াণ ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রি এবং তার কোটি ভক্তকে গভীরভাবে স্তম্ভিত করে। মৃত্যুর পর থেকেই এর প্রকৃতি নিয়ে দুটি স্পষ্ট ধারা তৈরি হয়—
একদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে এটিকে সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করা, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার অনুসন্ধানে উঠে আসা আত্মহত্যার তথ্য।
১. মৃত্যুর প্রেক্ষাপট ও প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকার ইস্কাটনের বাসভবন থেকে সালমান শাহ্র (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
* পরিবারের অবস্থান: শুরু থেকেই সালমানের মা নীলা চৌধুরী দাবি করে আসছিলেন যে তার ছেলেকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে তিনি মামলাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে মোড় ঘুরিয়ে ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন।
* প্রাথমিক তদন্ত: ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), সিআইডি এবং বিচার বিভাগীয় বিভাগীয় তদন্তে শুরু থেকেই ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে পরিবারের আপত্তির মুখে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মামলাটি পুনর্বিবেচনা ও পুনস্তদন্তের মধ্যে থাকে।
২. পরকীয়া বিতর্ক ও সামিরা-শাবনূর প্রসঙ্গ
সালমান শাহ্র মৃত্যুর পর তার ব্যক্তিগত জীবন, বৈবাহিক সম্পর্ক এবং তৎকালীন চলচ্চিত্র অঙ্গনের সম্পর্ক নিয়ে নানা ধরনের গুঞ্জন সামাজিক ও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
* সামিরা হকের ওপর অভিযোগ: পরিবারের পক্ষ থেকে সালমান শাহ্র স্ত্রী সামিরা হক এবং তার নিকটজনদের প্রতি সরাসরি হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার আঙুল তোলা হয়। তবে সামিরা শুরু থেকেই এই দাবি অস্বীকার করে আসছিলেন এবং সম্পর্কের নানাবিধ টানাপোড়েনের কথা জানান।
* শাবনূরের সাথে গুঞ্জন: সালমানের মৃত্যুর সময়ে তিনি ও অভিনেত্রী শাবনূর ছিলেন ঢালিউডের সবচেয়ে সফল জুটি। তাদের অনস্ক্রিন রসায়নের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিক বিতর্ক তৈরি হয়। তৎকালীন কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, সালমান-শাবনূরের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সালমানের পারিবারিক ও বৈবাহিক জীবনে মারাত্মক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল।
৩. পিবিআই (PBI)-এর চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (PBI) তাদের ৬০০ পৃষ্ঠার বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তৎকালীন পিবিআই প্রধান বনজ কুমার দে জানান, তৎকালীন ৪৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।
পিবিআই-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়:
* হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রমাণ মেলেনি: সালমান শাহকে হত্যা করার মতো কোনো আলামত বা পেশাদার খুনিদের যুক্ত থাকার সত্যতা পাওয়া যায়নি।
* আত্মহত্যার কারণ: মানসিক চাপ, পারিবারিক ও বৈবাহিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ব্যক্তিত্ব এবং অতিরিক্ত রাগ থেকেই তিনি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন।
* ঘটনার সূত্রপাত: মৃত্যুর পূর্ববর্তী দিনগুলোতে সামিরা ও শাবনূরের বিষয় নিয়ে ঘরে অশান্তি এবং বেশ কিছু ক্ষোভমূলক ঘটনার তথ্য পিবিআই-এর জবানবন্দিতে উঠে আসে।
৪. তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লিখিত আত্মহত্যার ৫টি প্রধান কারণ
পিবিআই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সালমানের মানসিক চাপ ও চরম সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী ছিল:
* নায়িকা শাবনূরের সাথে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা: শাবনূরের সাথে সম্পর্কের কারণে স্ত্রী সামিরার সাথে প্রতিনিয়ত ঝগড়া ও পারিবারিক অস্থিরতা তৈরি হওয়া।
* পারিবারিক কলহ: মা নীলা চৌধুরীর সাথে সালমান ও সামিরার সম্পর্ক এবং পারিবারিক নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদের মানসিক চাপ।
* দাম্পত্য জীবনে টানাপোড়েন: সামিরার সন্তান না হওয়া এবং দাম্পত্য জটিলতা নিয়ে তৈরি হওয়া বিষণ্ণতা।
* অত্যধিক আবেগপ্রবণ আচরণ: সালমান শাহ্র স্বভাবজাত অতিরিক্ত আবেগ ও রাগের বশে একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টা বা হুমকি দেওয়ার প্রবণতা।
* জটিল জীবনযাপন: একের পর এক মানসিক চাপ সামলাতে না পেরে আকস্মিক এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
সালমান শাহ্র মৃত্যু ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রহস্যময় ঘটনাগুলোর একটি হয়ে রয়েছে। আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত সংস্থা পিবিআই এটিকে আত্মহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করলেও, তার পরিবার ও অনুরাগীদের একটি অংশের মনে আজও এই মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্কের অবসান ঘটেনি।